১১ দলের লংমার্চে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য (যশোরে পথসভায়)
১১ দলীয় জোটের লংমার্চের অংশ হিসেবে যশোরে অনুষ্ঠিত পথসভায় বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি, কর্মসংস্থানের সংকট, জ্বালানি সমস্যা, ব্যাংক খাতের অবস্থা এবং রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের নানা বিষয়।
এ সময় তিনি বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে বিরোধী দলের ভূমিকা, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক আপসকামিতা নিয়েও কথা বলেন। যশোরের পথসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে কী কী বিষয় উঠে এসেছে, কী বার্তা দিয়েছেন তিনি এবং কেন তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ, তা তুলে ধরা হলো।
১১ দলের লংমার্চে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য
পরিস্থিতিতে আমরা দেখতে পেয়েছি, সারা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রান্তে এক নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ বিরাজ করছে। যেখানে আমাদের মন খারাপ করারও অধিকার নেই। যেখানে আমরা নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে কথা বলি, নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা দেখতে পাই, বিএনপি সরকার পুলিশ দিয়ে জোর করে বাসা থেকে মানুষকে তুলে নিয়ে যায়।
আমরা দেখতে পেয়েছি, ময়মনসিংহে যখন এক নারী বিএনপিকে ভোট দিয়ে ভুল স্বীকার করে, তার মধ্যে বোধোদয় হয়েছে যে বিএনপিকে ভোট দেওয়া তার উচিত হয়নি, এই বিষয়টি যখন সে ফেসবুক লাইভে এসে তার বক্তব্যে বলেছে, তখন বাসা থেকে পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে।
আমরা এমন এক সময় কথা বলছি, যখন প্রতিবাদ করলে আইজিপি আমাদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখান।
প্রিয় বিএনপি সরকার, আপনারা যদি ক্রসফায়ার দেওয়া শুরু করেন, তাহলে আপনাদের দলের একজন লোককেও আপনারা খুঁজে পাবেন না।
কারণ, ক্রসফায়ার যদি দিতে হয়, তাহলে চাঁদাবাজদের দিতে হবে।
টেন্ডারবাজদের দিতে হবে।
যারা মহিষের ঘাসে বিষ দেয়, তাদের দিতে হবে।
যারা পুকুরের মাছে বিষ দেয়, তাদের দিতে হবে।
যারা ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে চাঁদা নেয়, তাদের দিতে হবে।
যারা চাকরির কথা বলে ঘুষ নেয়, তাদের দিতে হবে।
যারা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা নেয়, তাদের ক্রসফায়ার দিতে হবে।
আর পুলিশ যখন এই ক্রসফায়ার দেবে, তখন আপনাদের নিজ দলের ব্যক্তিদেরই দিতে হবে। কারণ, বিএনপির সবাই চাঁদাবাজি করে না, এটা যেমন সত্য; কিন্তু যারা চাঁদাবাজি করে, তারা প্রত্যেকেই বিএনপির।
প্রিয় যশোরবাসী, আজকে আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছি, যখন আমাদের চাকরি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেলেরা পড়াশোনা শেষ করে বের হয়। চাকরির আশায় ঘরে ঘরে যেতে হয়, দুয়ারে দুয়ারে ফিরতে হয়, কিন্তু চাকরি নেই।
আমরা দেখতে পেলাম, জাপান থেকে ফিরে এসে সরকার এক ধরনের অসত্য তথ্য প্রচার করল। জাপান নাকি আমাদের এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। সেটা বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করল। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম, জাপান সরকার বলল, তাদের সঙ্গে এ ধরনের কোনো চুক্তি হয়নি।
আমরা দেখতে পেলাম, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এসে বলা হলো, দুই লাখ কর্মসংস্থান নাকি করা হবে। কিন্তু মালয়েশিয়া বলল, এ ধরনের কোনো চুক্তি নাকি হয়নি।
আমাদের দেশের মানুষ ভাত চায়। আমাদের দেশের মানুষ কর্মসংস্থান চায়। আমাদের দেশের মানুষ জ্বালানি চায়। আমাদের দেশের মানুষ নিরাপদে বাঁচতে চায়।
বিএনপি সরকার, আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের জ্বালানি দিন। আমাদের কর্মসংস্থান দিন। না হলে এ দেশের জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসবে।
প্রিয় যশোরবাসী, আমরা দেখলাম, নির্বাচনের আগে আমাদের বলা হলো, রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার করা হবে।
কিছুদিন আগে আমরা দেখলাম, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর এমডি হিসেবে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির ডিএমডিদের দিয়ে বাংলাদেশের সোনালী, রূপালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন পদে এমডি বসানো হচ্ছে।
অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই ব্যাংকগুলোতে ঋণখেলাপিরা ঋণ নিয়ে নিয়ে ব্যাংকগুলোকে পঙ্গু করে ফেলেছে। এই ব্যাংকগুলোকে আবার ঘুরে দাঁড় করানোর কোনো প্রকল্প বাংলাদেশের এই বিএনপি সরকারের নেই।
জনাব তারেক রহমান এসে বলেছিলেন, (we have plan)। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম, তাঁর এমন ধরনের প্ল্যান, যে প্ল্যানের মধ্যে নেতার হাতে কর্মীর খুন হতে হয়।
আমরা দেখলাম, এমপির ছেলের হাতে কর্মীকে খুন হতে হয়।
আমরা দেখতে পেলাম, নিজের দলের হাতে নিজের দলের নেতাকর্মীদের খুন হতে হয়।
এই ধরনের মাস্টারপ্ল্যান আমরা চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম দেশ গড়ার প্ল্যান। কিন্তু দেখতে পেলাম, বিএনপির কোনো প্ল্যানই নেই (BNP has no plan at all)।
প্রিয় যশোরবাসী, আজকে আমরা এখানে যারা উপস্থিত হয়েছি, আমরা হচ্ছি বিরোধী দল। বিরোধী দলকে মনে করা হয় বিকল্প সরকার। আমাদের সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। বিরোধী দলের যে ধরনের ভূমিকা, সে ধরনের ভূমিকা আমাদের দেখাতে হবে।
আমাদের শুধু ভূমিকা দেখালে চলবে না। আমরা ঢাকায় বলব, ভোটে কারচুপি হয়েছে। আবার আমরা ফলাফল মেনে নেব। এ ধরনের বিরোধী দলের ভূমিকা দেখালে হবে না।
যদি কারচুপি হয়ে থাকে, তাহলে চোখে চোখ রেখে বলতে হবে, সেটা কারচুপি হয়েছে।
আমরা একবার বলব, কারচুপি হয়েছে। আবার গিয়ে মিষ্টি খেয়ে আসব।
এ ধরনের বিরোধিতা হতে পারে না।
আমাদের যারা নেতা রয়েছেন, আমাদের নেতাদের মাথায় রাখতে হবে, অনেক তরুণ প্রজন্মকে আপনারা রাস্তায় নামিয়ে রাজনীতি করছেন। সুতরাং, এই তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। এই তরুণ প্রজন্ম আপসের স্বপ্ন আর দেখে না।
এই তরুণ প্রজন্ম ২৪-এর আন্দোলনে রাস্তায় এসে রক্ত দিয়েছে। এই তরুণ প্রজন্ম শুধুমাত্র রক্ত দিতেই রাস্তায় আসবে না; বরং ক্ষমতা চালাতে, দেশ চালাতে, নতুন বাংলাদেশ গড়তে তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে আসবে।
সুতরাং, রাজনীতি স্পষ্ট করতে হবে। বিরোধিতার জায়গা স্পষ্ট করতে হবে। আপসকামিতার বিরোধিতা আর আমরা দেখতে চাই না।
সেজন্য আপনারা যারা আজকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, আমাদের শপথবদ্ধ হতে হবে। আমরা যদি সরকারে যাই, তাহলে যেন জনগণকে সুশাসন দিতে পারি, সে প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে।
প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ে যেন আমাদের যথাযথ লোক থাকে। টুকু আসে, টুকু যায়—এ ধরনের মন্ত্রী যেন আমাদের না হয়। আমাদের যথাযোগ্য মন্ত্রীকে যেন যথাযোগ্য চেয়ারে বসাতে পারি, সেজন্য আমাদের প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।
সেজন্য আপনারা দেখেছেন, সাথী আক্তারকে যখন ময়মনসিংহে শুধুমাত্র বিরোধিতা করার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমাদের এনসিপির নেতাকর্মীরা যথাযথ বিরোধিতার মাধ্যমে তাঁর জামিন নিশ্চিত করতে পেরেছে।
সেজন্য বিরোধিতার জায়গায় কোনো ধরনের আপসকামিতা চলবে না। হতে পারে না। হতে দেওয়া হবে না।
প্রিয় যশোরবাসী, আমাদের এই লংমার্চের মধ্য দিয়ে আমাদের যে সংস্কারের দাবি, তা তুলে ধরতে চাই। আমরা শুধুমাত্র চেয়ার পরিবর্তনের জন্য এই নির্বাচন করিনি।
শুধুমাত্র এই বিদ্যমান কাঠামো যদি ঠিক থাকে, তাহলে চলবে না।
আমরা বারবার বলেছি, জনাব তারেক রহমানকে একটি ফিটনেসবিহীন, ইঞ্জিনবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই গাড়িটি চালানোর জন্য আমরা জনাব তারেক রহমানকে বলব, আপনি যতই ভালো ড্রাইভার হন না কেন, আওয়ামী লীগ সরকার এই বাসের ইঞ্জিন নষ্ট করে ফেলেছে। এই বাসের, বাংলাদেশ নামের বাসের চাকাগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। আপনি যত ভালো ড্রাইভারই হন না কেন, এই বাসটি আপনি চালাতে পারবেন না।
যতদিন না পর্যন্ত ইঞ্জিনটি ঠিক করা হয়, যতদিন না পর্যন্ত চাকাগুলো পরিবর্তন করা হয়, যতদিন না পর্যন্ত বাসের ফিটনেস পরিবর্তন করা হয়, ততদিন এই বাস সঠিক পথে যাবে না।
সেজন্য আমরা চেয়েছিলাম রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার। আমাদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
পিএসসির সংস্কার করতে হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পিএসসিকে আবার দলীয়করণ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণ করা হচ্ছে। আমরা দেখতে পেয়েছি, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হচ্ছে। আমাদের এর বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।
একই সঙ্গে বৃহত্তর লড়াইয়ের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।
১ হাজার ৮০০ টাকার জ্বালানি তেল বাংলার মানুষ ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে এলএনজি কিনতে পারবে না। ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে হবে। মাঝখানে যারা সিন্ডিকেট আছে, এই সিন্ডিকেটের বিষটাকে উপরে ফেলতে হবে।
সেজন্য আজকে আপনারা যারা উপস্থিত হয়েছেন, আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারে যারা রয়েছেন, আপনারাও জানেন, বাংলাদেশ আপনারা চালাতে পারছেন না। এই মাসেও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দেওয়ার জন্য আপনাদের ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।
বাংলাদেশের একটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ভালো নেই। একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ভালো নেই। ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না। ব্যবসায়ীরা কলকারখানাগুলো ঠিকভাবে চালাতে পারছেন না চাঁদাবাজির কারণে।
সেজন্য আপনারা যদি মনে করেন, বিরোধী দলের সহায়তা ছাড়া আপনারা সরকার ঠিকভাবে চালাতে পারবেন, তাহলে আপনারা ভুল ভাবছেন।
সেজন্য আমরা চাই, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে। সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
আমাদের কি কোনো লক্ষ্য আছে?
আমাদের কোনো লক্ষ্য আছে?
আমাদের সংস্কারের লক্ষ্য আছে।
আপনারা সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। পরিবর্তিত বাংলাদেশে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। সংস্কারের বাংলাদেশে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে।
বিএনপি বলেছিল, সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা এখন বলছি
চাঁদা খেয়ে করল শেষ, ওই সবার আগে বাংলাদেশ!
চাঁদা খেয়ে করল শেষ!
চাঁদা খেয়ে করল শেষ!
সবার আগে বাংলাদেশ!
আমার সোনার বাংলাদেশ!
চাঁদা খেয়ে করল শেষ!
চাঁদা খেয়ে করল

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url