২০ অক্টোবর ২০২৬: ভাইরাল খবর মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য (পুরো বক্তব্য একসাথে)
২০ অক্টোবর ২০২৬: ভাইরাল খবর মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য (পুরো বক্তব্য একসাথে)
আজ (২০ অক্টোবর ২০২৬তারিখে) জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ডাকেন।
এই সংবাদ সম্মেলন ডাকার মূল কারণ হলো ১৯ অক্টোবর জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা।
এই বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান কেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের পুরো বক্তব্যটি
বিরোধীদলীয় নেতাকে যথাযথ সম্মান না দিয়ে আমন্ত্রণ জানানোর অভিযোগ করেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন: বিরোধীদল নেতাকে আপনারা কার্ড পাঠিয়ে দিলেন, কোথায় বিরোধীতার নাম আছে? তিনি ওখানে গিয়ে কি সাধারণ শ্রোতাদের চেয়ারে বসবেন?
আরেকটি কথা উনারা বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা ওসমানী উদ্যানে যে গতকালকের স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন হয়েছে, সে অনুষ্ঠানে উনি যাননি। আমরা খুব দুঃখের সাথে বলছি, আমরা দাওয়াতপত্র পেয়েছিলাম আমাদের অফিসে। এই দেশে দাওয়াত জামাতের আমির এবং সেক্রেটারি জেনারেলকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। আমরা কেন যাইনি, আপনাদের কাছে আজকে প্রশ্ন, জাতির কাছে আমরা প্রশ্ন রাখছি।
মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডক্টর শফিকুর রহমান সাহেব, রুলস অফ প্রেসিডেন্স, সরকারি প্রোটোকল অনুযায়ী তিনি হচ্ছেন একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদ ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। সবাই জানেন, আপনারা দেখছেন, কালকে উনাদের দাওয়াতপত্রটা এখানে প্রধান অতিথি, সভাপতি যিনি সরকারের নিয়োগকৃত সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক, সেখানে প্রতিমন্ত্রী আছে, স্থানীয় সরকারের সচিব আছে, বিভিন্ন ব্যক্তিরা সেখানে অতিথির আসন অলংকৃত করবেন। সময় দিয়ে সূচি দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদল নেতাকে আপনারা কার্ড পাঠিয়ে দিলেন, কোথায় বিরোধীদলীয় নেতার নাম আছে? তিনি ওখানে গিয়ে কি সাধারণ শ্রোতাদের চেয়ারে বসবেন, নাকি তার মঞ্চে? তিনি কি বিশেষ অতিথি, না আমন্ত্রিত কোনো অতিথি? তিনি যে লিডার অফ অপজিশন হিসেবে একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদা হোল্ড করেন, পজিশন, আপনি তো এই দাওয়াত কার্ডে বিরোধী দলের দেশের উনি জামাতের নেতা হিসেবে আমরা সেটা বলি না। কিন্তু অপজিশন হিসেবে এই সম্মান এই অনুষ্ঠানে তার প্রাপ্য ছিল।
আপনারা আমাদের এই বিরোধীদলীয় নেতাকে এই অনুষ্ঠানের জন্য তার প্রাপ্য যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তা যদি দিতেন, তাহলে এই কার্ডে আমরা—তিনি ওখানে গিয়ে কোন জায়গায় তার আসন হবে? কোথায় তিনি বসবেন? এখানে গেলে তো উনি সাধারণ শ্রোতাদের চেয়ারে, গ্যালারিতে বসতে।
আপনারা কি চান? এত বড় একটা বিরোধী দলের নেতা এইভাবে একটা বড় ধরনের সরকারি অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি অপমানিত হবেন? বিরোধী দলকে ছোট করার জন্য এই ব্যবস্থাটা করা হয়েছে।
কথা শুধু একটা বলেই দিলে হবে যে, উনি আসেননি আমাদের অনুষ্ঠানে। ফলে আমরা এই ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি। এটা উনারা অন্যায় করেছেন, বিরোধী দলের প্রতি অবিচার করেছেন।
সরকারের সমালোচনা করলেই রাষ্ট্রবিরোধী বলা হচ্ছে এই উত্তরে তিনি বলেন: আমরা যদি সরকারের দুর্নীতি, দলীয় কর্মের বিরুদ্ধে কথা বলি, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলছে—এই কথা বললে স্বৈরাচার এসে যাবে, ফ্যাসিস্ট এসে যাবে, তাদের আনার পথ করা হচ্ছে, জুলাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে।
এই কথা বলে প্রকারান্তরে আপনারা একদলীয় কর্তৃত্ব খাটিয়ে বরং নিজেরাই ফ্যাসিবাদকে আসার সুযোগ করে দিচ্ছেন। বিরোধীদলকে আপনারা অন্যায়ের বিরোধিতা করতে দেবেন না। সেটাকে আপনি শহীদের বিরোধিতা বলবেন, জুলাইয়ের বিরোধিতা বলবেন। সরকারের অপকর্মের বিরোধিতা করলে আপনি রাষ্ট্রের বিরোধিতা বলবেন, জুলাইয়ের বিরোধিতা বলবেন।
তাহলে তো আপনি সরকার, রাষ্ট্র আর সরকারি দলের সংজ্ঞাটা আপনাকে শিখতে হবে। বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের সমস্ত গণবিরোধী কাজের বিরোধিতা করা। জনদুর্ভোগ সম্পর্কে কথা বলা, রক্ত ঝরা, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি করা। এটা তো বিরোধী দলের দায়িত্ব। পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতারা সেই ভোকা সবার দায়িত্ব।
এখন আপনি এই কথা বললে বলবেন, এটা জুলাই শহীদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কি পড়ুন, সরকারের দায়িত্বকে পড়ুন। আপনি তো সরকার ও সরকার দলকে এক করে ফেলেছেন।
এজন্য নিজেদের দলীয়করণ, ব্যর্থতা, দুর্নীতির ঢাকার জন্য জুজুর ভয় দেখিয়ে সব দায় বিরোধী দলের উপরে চাপাবার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
আমরা কখনো এই ফ্যাসিস্টকে আসার সুযোগ আমরা করে দিচ্ছি না। বরং আপনারা এত বড় বিরোধী দলের সমস্ত আন্দোলনকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে যে অরাজকতা, দেশের অস্থিতিশীলতা তৈরি করছেন, এই পথ দিয়ে বরং আপনারা ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছেন।
সংবিধান সংস্কার ও বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ তিনি বলেন: কেন আপনারা বিরোধী দল, সরকার দল একসাথে সম্মিলিত প্রয়াসে আসুন, সংবিধান কী করে সংস্কার করা যায়? আপনারা বসবেন না। সব বাদ দিয়ে আপনারা একটা বিশেষ কমিটি করলেন দলীয় লোকদেরকে নিয়ে।
আর বাইরে গিয়ে বলছেন যে উনারা আসছেন না, উনারা না আসলে বিরত অবকাশ থাকবে। এগুলো দায়সারা গোছের কথা। আপনারা সরকারি দলের ভূমিকা আপনারা পালন করছেন।
এছাড়াও তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বক্তব্য দেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন: সম্প্রতি পাবলিক সার্ভিস কমিশন, যেখানে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ক্যাডার সার্ভিসে মেধার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নিয়োগের একটা ব্যবস্থা ছিল, যার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রথম আন্দোলন শুরু করে, “উই ওয়ান্ট জাস্টিস” বলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল, “কোটা নয়, মেধা”—সেটার বিরুদ্ধে এখন সরকার পিএসসির চেয়ারম্যানসহ পিএসসির মেম্বারদেরকে চা খেতে দাওয়াত দিয়ে দিয়ে তাদেরকে বিদায় দিচ্ছে। দলীয় লোক তারা ঢুকাবে। এটি কি জুলাইকে ধারণ করা? আপনারা বলেন।
এছাড়াও, তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে বলেন: রাষ্ট্রপতি ১৩ই নভেম্বর ২০২৫-এ যে প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার জারি হলো, যার বিরুদ্ধে গণভোট আর জাতীয় ভোট একদিনও হলো, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হলো রক্তাক্ত জুলাই সনদকে কার্যকরী করার—এটি হচ্ছে আইনি ভিত্তি ছিল।
সেটাকে সালাউদ্দিন সাহেব পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এটা হচ্ছে মহাপ্রতারণার একটা দলিল। কী আজব ব্যাপার! এটি কি জুলাইকে ধারণ করা?
জুলাই সনদ কার্যকর করার সর্বসম্মত একটা আইনি ভিত্তি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। সেটাকে আপনি একটা প্রতারণার দলিল পার্লামেন্টের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে কথা বললেন, আর আপনি জামাতকে অভিযুক্ত করেন যে আমরা জুলাইকে ধারণ করি না।
শেষে দিকে বক্তব্য দেওয়ার সময় মিয়া গোলাম পরওয়ার জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি করেন। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন: আমাদের নেতা আমিরে জামাত শফিকুর রহমান, যিনি এখন লিডার অফ দ্য অপজিশন, ৫ই আগস্টের পরে এবং আগে এই জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছে, প্রায় সহস্রাধিক ১৪০০ শহীদ, জাতিসংঘ বা নানান হিসাবে আট শতাধিক বলা হয়, কিন্তু শহীদের সংখ্যা ১৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।
অধিকাংশ শহীদদের পরিবারে আমিরে জামাত নিজে এবং জামাত নেতৃবৃন্দ ফিজিক্যালি সাক্ষাৎ করেছে, তাদের পরিবারের সাহায্য করেছেন। জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা করেছেন। দেশে-বিদেশে ভূমিকা রেখেছেন।
আমি চ্যালেঞ্জ করলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যারা আজকে এই অপবাদ দিচ্ছেন, আপনারা বলেন, আপনি কয়টা শহীদের বাড়িতে গিয়েছেন? কয়টা জুলাই আহত যোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছেন? কত টাকা আপনার দলীয় তহবিল থেকে দিয়েছেন? বলেন।
সরকারের ক্ষমতায় বসে সরকারের টাকা খরচ করতে, জুলাই যোদ্ধাদের নাম ভিক্ষা করে আপনাদের দলীয় ফান্ড মজবুত করছেন। জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধাদের পাশে আপনারা দাঁড়াননি। এই কাজ করেছে জামাত ইসলামী।
এছাড়াও, তিনি জুলাই শহীদদের জীবনী নিয়ে প্রকাশনা সম্পর্কে বলেন: জামাত ইসলামী নিজস্ব চেষ্টায় সমস্ত শহীদের পরিবারে গিয়ে, বাড়িতে গিয়ে ছবি সংগ্রহ করে, তার ঘটনাবলি, পিতা-মাতার পরিচয় তুলে ধরে জুলাই শহীদদের উপরে বিশাল ১০ খণ্ডের সংকলন প্রকাশ করেছে বাংলা ভাষায়, ইংরেজি ভাষায়, আরবি ভাষায়।
সারা দুনিয়াতে জুলাইয়ের শহীদকে, জুলাই যোদ্ধাদেরকে জামাত ইসলামী পরিচিত করেছি। ১২ খণ্ডে আমরা এটা, এটা আমরা ধারণ করি। এটাই প্রমাণ।
আমরা খুব কষ্টের সাথে বলছি, এক্ষেত্রে সরকারের কোনো ভূমিকা নাই। সরকার কি বলতে পারবে যে সকল শহীদের জীবনীসম্বলিত কোনো প্রকাশনা সরকারের আছে?
সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা, একটা জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় করা হলো। মাসের পর মাস তাদের বেতন বাকি। তারা অভিযোগ করেছে আমাদের কাছে যে আমাদের বেতন হয় না। একটা স্মৃতি জাদুঘর করা হয়েছে।
ফলে এই কথাগুলো সরকারের মুখে বেমানান। এটা বলে আপনারাই বরং জুলাই যোদ্ধাদের সাথে হাস্যকর উপহাস করেছেন। আমরা এটার তীব্র নিন্দা করি।
বক্তব্যের শেষে তিনি জানান: আমরা যে জুলাইকে ধারণ করি, তার বড় স্যাক্রিফাইস ঐকমত্য কমিশনে।
যে ৮৪টি বিষয়ে একমত হওয়া গিয়েছিল, সেখানে বিএনপি মৌলিক অনেকগুলো বিষয় নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। যে নোট অব ডিসেন্ট ভিন্নমতের উপরে শক্ত থাকার কারণে তারা আজকে জুলাই সনদকে এড়িয়ে তারা নিজেদের মত বিশেষ কমিটি করে, তারা সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের পথে যাচ্ছে। বিশেষ কমিটি করেছে।
তারা স্যাক্রিফাইস করতে পারলো না, তাদের ভিন্নমত থেকে সরে যেতে পারলো না। আর জামাত ইসলামী পাঁচটি বিষয় পয়েন্ট অব নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। আমাদের কাছে রেকর্ড, আপনাদের কাছে রেকর্ড। জুলাই সনদের বইটা দেখবেন, পাঁচটি দফাতে জামাতের নোট অব ডিসেন্ট ছিল।
জামাত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৃহত্তর স্বার্থে, ঐকমত্য কমিশন গণভোটের ব্যালটে যে চারটি বিষয়কে সন্নিবেশিত করে ৮৪টি ঐকমত্যের ব্যাপারে প্রস্তাবনা পেশ করেছে, সেই স্বার্থে আমরা কিন্তু আমাদের পাঁচটা নোট অব ডিসেন্টের উপরে আমরা শক্ত থাকব—আমরা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে একমত হয়েছি।
বিএনপি তার নোট অব ডিসেন্টের উপরে আজকে শক্ত থাকতে গিয়ে একটা ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের জন্য সেই সংবিধানকে ফ্যাসিবাদী ফ্রেমে রাখছে।
এই ফ্রেমে তারা যেভাবে এটাকে সংস্কার না করে সংশোধনের নামে আগাচ্ছে, এরকম সংশোধিত গঠনতন্ত্রে যে রাষ্ট্র আসবে, যে প্রধানমন্ত্রী হবে, সে আরেকটা হাসিনা ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে।
আমরা সেই পথ থামাতে চেয়েছি। ফলে আমরা জুলাইকে, জামাত ইসলামী আমরা ধারণ করি। ধারণ করি বলেই এই প্রমাণগুলো দিলাম। এ কথা উনাদের বলা উচিত না।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url