শিশির মনিরের বক্তব্য: মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর নিয়ে যা বললেন

শিশির মনির মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর নিয়ে কথা বলছেন

আজ ২৬ অক্টোবর ২০২৬ মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামিন পাননি। জামিন নামঞ্জুর করেন ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৫। 

তাঁর আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করবেন।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদনের শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সামনে শিশির মনির বক্তব্য দিয়েছেন।

শিশির মনির মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর নিয়ে কী বলেছেন, তাঁর বক্তব্য, আইনি যুক্তি ও হাইকোর্টে জামিন আবেদনের পরিকল্পনা জানুন।

শিশির মনিরের বক্তব্য: মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর নিয়ে যা বললেন

মিস্টার আখতারুজ্জামান কি অপরাধ করেছেন? তিনি যা বলেছেন, তা তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত এক কোটি ৫৭ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর দাবির কথাই। তিনি বাস্তবে বিমানবন্দরে সেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি তো কারও গায়ে হাত দেননি। তিনি কোনো অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করেননি। তিনি কাউকে আঘাত করেননি। তাহলে তিনি কী করেছেন? ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, রাগ প্রকাশ করেছেন। ক্ষোভ ও রাগ প্রকাশের কারণে তিনি ২৪ দিন কারাগারে আছেন। তাতেও কি সরকারের কাছে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না? একজন মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করলে তাঁকে আর কত দিন জেলে থাকতে হবে?

তিনি কি কাউকে মেরেছেন? এমন কোনো অভিযোগ আছে? উত্তর হলো, না। তিনি কি কারও গায়ে হাত দিয়েছেন? উত্তর হলো, না। তিনি কি কাউকে আঘাত করেছেন? উত্তর হলো, না। তিনি কি কোনো অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করেছেন? উত্তর হলো, না।

তাহলে হ্যাঁ, তিনি কী করেছেন? তিনি বাক্যবিনিময় করেছেন। বাক্যবিনিময়ের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত এক কোটি ৫৭ লাখ প্রবাসী যে সুবিধা পেয়েছেন, সেই কারণে আখতারুজ্জামান সাহেবের জেলে থাকার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

মেজর আখতারুজ্জামান সাহেব একজন সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ৭৩ বছর বয়সী একজন মুক্তিযোদ্ধা।

বিমানবন্দরে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেই মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁকে জামিন দেননি। এরপর আমরা জজ আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করেছিলাম। আজ সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে।

জামিনের আবেদনে আমরা তিনটি বিষয় তুলে ধরেছিলাম।

প্রথমত, যে ধারাগুলোতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাকিগুলো জামিনযোগ্য। জামিনযোগ্য ধারায় জামিন পাওয়া আসামির অধিকার, আদালতের বিবেচনাধীন কোনো বিষয় নয়। তাই আমরা আশা করেছিলাম, জামিন যদি তাঁর অধিকার হয়ে থাকে, তাহলে আদালত সেই অধিকার তাঁকে দেবেন। কিন্তু আদালত আমাদের এই যুক্তি শোনেননি।

দ্বিতীয়ত, আমরা বলেছি, এ ধরনের মামলা থানায় করা যায় না; আদালতে নালিশি মামলা হিসেবে দায়ের করতে হয়। কিন্তু এই মামলা করা হয়েছে এফআইআর আকারে, যা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫ ধারার সরাসরি লঙ্ঘন বলে আমরা মনে করি। আইন লঙ্ঘন করে এভাবে মামলা করা সমাজে কোনো ভালো উদাহরণ তৈরি করে না।

তৃতীয়ত, আমরা বলেছি, বিমানবন্দর নিয়ে মেজর আখতারুজ্জামান যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, সরকার সেই উদ্বেগকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে বিমানবন্দরে উন্নত পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং তিনজন বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বিমানবন্দরের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছেন।

তাহলে মিস্টার আখতারুজ্জামান কী অপরাধ করেছেন?

তিনি যা বলেছেন, তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত এক কোটি ৫৭ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর দাবির কথাই। তিনি বিমানবন্দরে বাস্তবে সেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি কারও গায়ে হাত দেননি, কোনো অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করেননি, কাউকে আঘাত করেননি।

তাহলে তিনি কী করেছেন? ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, রাগ প্রকাশ করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশের কারণে তিনি ২৪ দিন ধরে কারাগারে আছেন। তাতেও কি সরকারের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি? একজন মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করলে তাঁকে আর কত দিন কারাগারে থাকতে হবে?

আমি মনে করি, শুধু ক্ষমতা আছে বলে সেই ক্ষমতার ব্যবহার করে কাউকে আটকে রাখার এই নজির কখনোই ভালো উদাহরণ তৈরি করে না।

আমি আপনাদের আরেকটি ছোট্ট কথা বলে যেতে চাই। আমরা চাই, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকুক। স্বাধীনতাই মানুষের একমাত্র রক্ষাকবচ। বিচার বিভাগ যখন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, তখন সেই সিদ্ধান্ত হতে হবে আইন অনুযায়ী। সিদ্ধান্ত কার পক্ষে গেল, কার বিপক্ষে গেল, সেটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো, আইনে যা বলা আছে, বিচার বিভাগ সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না। যখন তা পারবে, তখনই আমরা বলতে পারব, বিচার বিভাগ স্বাধীন ও সার্বভৌম।

আমি একটি অনুরোধ জানিয়ে শেষ করছি। জামিন নামঞ্জুরের এই আদেশের বিরুদ্ধে আমরা অতিদ্রুত হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করব। আমরা আশা করি, হাইকোর্ট বিভাগে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জনাব আখতারুজ্জামান জামিন পাবেন, ইনশা আল্লাহ।

এর সঙ্গে একটি ছোট্ট অনুরোধ থাকবে। আখতারুজ্জামান সাহেবের না হয় কিছুটা কষ্ট হয়েছে। তিনি না হয় ২৪ দিন জেলেই কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর কারণে যে বাংলাদেশের এক কোটি ৫৭ লাখ মানুষের উপকার হয়েছে, আমার ধারণা, আখতারুজ্জামান সাহেব জেলে থেকেও কিছুটা হলেও মুচকি হাসছেন।

এই মামলা করেছে সরকার। আমাদের বক্তব্য হলো, সরকার বেআইনিভাবে মামলা করেছে, আইন লঙ্ঘন করে মামলা করেছে। আদালতে যেন জামিন দেওয়া না হয়, সে জন্যও সরকার যুক্তি উপস্থাপন করছে। সুতরাং যা কিছু করছে, সরকারই করছে; এখানে দ্বিতীয় কোনো পক্ষ নেই।

তাই আমরা কাকে বলব? আমরা বলব, সরকারের এই আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন মানুষ তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশের কারণে তিনি ২৪ দিন ধরে কারাগারে আছেন। তাঁর বয়স ৭৩ বছর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলেই জেলে আছেন। তারপরও সরকারের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি, সরকারের রাগ কমেনি। সরকারের মাথা এখনো অনেকটাই গরম আছে। সেই কারণে আখতারুজ্জামান সাহেব ঠান্ডা পরিবেশে জেলের ভেতরে আছেন।

কিন্তু সরকার একজন বয়স্ক মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশের কারণে ২৪ দিন ধরে কারাগারে রেখেছে। এটি কি কোনো সাধারণ মানুষের সঙ্গে হওয়ার মতো আচরণ? হতে পারে না।

সরকারদলীয় কেউ হলে কি তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করা হতো? হতো না। সরকারদলীয় কোনো ব্যক্তি একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলে তাঁকে কি জেলে নেওয়া হতো? আমার মনে হয়, হতো না।

তাহলে এই কাজ কেন করা হচ্ছে? এ ধরনের আচরণের কারণে বাংলাদেশের মানুষ অসন্তুষ্ট হচ্ছে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে।

আমি গত ১৫ দিন বিদেশে ছিলাম। যেসব জায়গায় গিয়েছি, প্রতিটি জায়গায় মানুষের মধ্যে বিমানবন্দরে নাজেহাল ও হয়রানি নিয়ে অসন্তুষ্টি দেখেছি। আখতারুজ্জামান সাহেব তাঁদের সেই কণ্ঠস্বর হয়ে কথা বলেছেন।

সেজন্য যদি তাঁকে জেলে থাকতে হয়, আমার ধারণা, আখতারুজ্জামান সাহেব হাসিমুখেই তা মেনে নিয়েছেন।





এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url