মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ভাষণের বাংলা অনুবাদ
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে যায়। তখন ভারত, আজকের বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একসাথে ছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান যখন শেষ। এরপর ভারত বিভক্ত হয়ে যায়। ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র নামে দুটি রাষ্ট্রের নবজন্ম হয়।
ভারত ছিল একটি। আর পাকিস্তান ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে বিভক্ত কিন্তু একটি দেশ। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ ছিল, যা বর্তমানে বাংলাদেশ নামে পরিচিত।
সেই সময় অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবি এবং বাংলার ভাষাগত অধিকার নিয়ে বিতর্ক চলছিল।
সেই সময় অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন। তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবি এবং বাংলার ভাষাগত অধিকার নিয়ে বিতর্ক চলছিল।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘Student’s Role in Nation-Building’ শিরোনামে একটি বক্তৃতা দেন। এতে তিনি শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব, কর্মসংস্থান, জাতীয় ঐক্য এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের বাংলা অনুবাদ পড়ুন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ইংরেজি ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি বাংলায় পড়ুন। এটি বর্তমানে ইংরেজি থেকে বাংলায় ট্রান্সলেশন করা হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সমাবর্তন বক্তৃতা বাংলা অনুবাদ
ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়াগণ,
আপনাদের উপাচার্য মহাশয় যখন আমাকে এসে সমাবর্তনে একটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন, তখন আমি তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলাম, আমার নানামুখী ব্যস্ততার কারণে সমাবর্তনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা প্রস্তুত করা হয়তো সম্ভব হবে না, যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যেমন শিল্প, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, আইন ও প্রকৃতি—সম্পর্কিত আলোচনার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
যাই হোক, আমি অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে সমাবর্তন উপলক্ষে ছাত্রদের সামনে দু-একটি কথা বলব। এখন যে কথাগুলো বলব, তা আমার সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ বলেই বিবেচিত হতে পারে।
প্রথমেই উপাচার্য মহাশয়কে ধন্যবাদ জানাই, আমাকে বিভিন্ন প্রশংসাসূচক বিশেষণে বিশেষায়িত করার জন্য।
জনাব উপাচার্য, আমি এখন যা করছি কিংবা যতটুকু করতে সক্ষম হয়েছি, মোটামুটি সবই ছিল আমার দায়িত্ব পালন। একজন মুসলমান হিসেবে সততা ও নিঃস্বার্থতার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করাকে আমি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করি।
আপনাদের সঙ্গে আমি আজ যে কথাগুলো বলছি, তা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, বরং এমন একজন বন্ধু হিসেবে বলছি, যিনি আপনাদের স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ।
আপনাদের অনেকেই আজ ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাই। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে সাফল্যের মুকুট অর্জন করেছেন। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে আপনারা প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। সেখানেও আপনাদের সাফল্য কামনা করছি।
আপনাদের অনেকেই শিক্ষাজীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা ভাগ্যবান যে নিজেদের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, যে সুযোগ আপনাদের পূর্বপুরুষেরা পাননি।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের ফলে যে যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো সূচিত হয়েছে, তা আপনাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বুঝতে পারা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা পরাধীনতার শিকল ভেঙেছি। এখন আমরা মুক্ত মানুষ। আমাদের দেশ আমাদের নিজেদের। আমাদের সরকারও আমাদের নিজেদের। জনগণের জন্য, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে এবং রাষ্ট্রের উন্নতির লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
যাই হোক, স্বাধীনতা মানে কিন্তু যা ইচ্ছা তা করার লাইসেন্স পাওয়া নয়। এর অর্থ এই নয় যে আপনারা যা খুশি তাই করবেন, রাষ্ট্রের অন্যরা কী মনে করল, তা বিবেচনা না করে নিজেদের ইচ্ছামতো আচরণ করবেন।
আপনাদের ওপর অনেক দায়িত্ব রয়েছে। বলতে গেলে, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আপনাদের দায়িত্ব আরও বেশি।
আমাদের একটি ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হিসেবে কাজ করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের সময় যে সামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে এখন উন্নয়নমূলক শক্তির প্রয়োজন আরও বেশি। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেয়ে স্বাধীনতাকে সুসংহত করে দেশ গড়ে তোলা আরও কঠিন। জেলে যাওয়া কিংবা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা সরকার পরিচালনার চেয়ে সহজ।
বরং যেসব বিপদ আমরা কাটিয়ে উঠেছি এবং যেসব সমস্যা সামনে আসছে, সেগুলো সম্পর্কে আপনাদের কিছু কথা বলি।
পাকিস্তানের জন্ম ঠেকাতে না পারার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্য শত্রুরা এখন আমাদের দুর্বল করার এবং ধ্বংস করার পথ খুঁজছে।
এ কারণেই সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই পাঞ্জাব ও দিল্লিতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হাজার হাজার পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এমন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ পাঞ্জাবে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই দুর্ভাগা অভিবাসীদের পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের জন্য যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা যেকোনো বৃহৎ রাষ্ট্রকেও বিপাকে ফেলতে পারত।
কিন্তু যারা পাকিস্তানের জন্মকে আঁতুড়ঘরেই ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল, তারা হতাশ হয়েছে। পাকিস্তান সেই বিপর্যয় কেবল কাটিয়েই ওঠেনি, বরং আরও শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত হয়েছে।
এর সঙ্গে আরও কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেমন, ভারত কর্তৃক আমাদের প্রাপ্য অর্থ ও সামরিক সরঞ্জাম আটকে রাখা এবং অতি সম্প্রতি আপনাদের এই প্রদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করা।
আমার কোনো সন্দেহ নেই যে ভারতীয় জনগণের বিচক্ষণ অংশ এসব ঘটনাকে সমর্থন করেন না। যারা এসব ঘটাচ্ছেন, তাঁদেরও একসময় মানসিকতার পরিবর্তন হবে বলে আমি আশা করি।
তারপরও এসব বিষয়ে আপনাদের ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের ভূখণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি চালানোর ওপর তারা জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি আপনাদের প্রদেশের ওপর আক্রমণের ঘটনাটি রহস্যময় রূপ নিয়েছে।
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের শত্রুদের মধ্যে কিছু মুসলমানও রয়েছেন, যাঁরা প্রাদেশিকতাবাদের ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন, যাতে পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আগের মতো ভারতীয় আধিপত্যের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়।
যাঁরা এসব ভাবছেন, তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। যদিও এসব প্রচেষ্টা তাঁদের থামিয়ে রাখছে না। প্রতিদিন একের পর এক মিথ্যা ও বানোয়াট বিষয় তৈরি করা হচ্ছে, যাতে দেখানো যায় যে মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য নেই এবং তাঁদের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করা যায়।
সাম্প্রতিক ভাষাবিষয়ক বিতর্কের কথাই ধরুন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনাদের অনেকেই প্রাদেশিকতাবাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এই প্রদেশে প্রাদেশিকতাবাদের বীজ বপন করা হয়েছে, যদিও আপনাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মত দিয়েছেন।
আপনাদের মনে কি কখনো এই প্রশ্ন জাগে না যে যেসব প্রদেশের পত্রপত্রিকায় পাকিস্তানকে কেবল অভিশাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তারাই এখন ভাষার ব্যাপারে আপনাদের অধিকার শেখাতে আসছে?
আপনাদের কি মনে হয় না যে অতীতে যাঁরা মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তাঁরাই হঠাৎ ভাষার বিষয়ে আপনাদের বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন এবং আপনাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাচ্ছেন?
এই পঞ্চম বাহিনীর লোকদের থেকে সাবধান থাকুন।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরেকবার ব্যাখ্যা করছি।
এই প্রদেশের সরকারি কাজকর্মের জন্য এ প্রদেশের জনগণ যে ভাষা পছন্দ করবেন, তাঁরা তা বেছে নিতে পারেন। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। দেশের জনগণ তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপযুক্ত সময়ে নিজেদের পছন্দের ভাষা নির্ধারণ করবেন।
যাই হোক, বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ভাষা অবশ্যই উর্দু হবে, অন্য কিছু নয়।
সুতরাং রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এবং অবশ্যই উর্দু। এটি এমন একটি ভাষা, যা উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানের নিবিড় পরিচর্যায় বিকশিত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিটি অঞ্চলে অন্য যেকোনো প্রাদেশিক ভাষার তুলনায় এই ভাষা অধিকসংখ্যক মানুষ বুঝতে পারেন। এটি মুসলমানদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রের ভাষাগুলোর সঙ্গেও অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে উর্দুকে বিতাড়িত করা, এমনকি সরকারি ব্যবহার থেকেও উর্দুকে বাদ দেওয়ার ঘটনা বিনা কারণে ঘটেনি।
ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে যারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইছে, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনারা সচেতন থাকুন। এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করার পেছনে তাদের যে উদ্দেশ্য রয়েছে, তা তারা স্বীকার করবে না, কারণ তা তাদের মনোবাসনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভাষাবিষয়ক বিতর্ক সৃষ্টির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা এবং অবাঙালি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া।
অবশ্য ভাষাবিষয়ক বিতর্কের মধ্যে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী করাচি থেকে ফিরে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন—বাঙালিরা ইচ্ছা করলে বাংলাকে প্রাদেশিক সরকারি ভাষা করতে পারেন—তা শুনে তারা নিজেদের কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে।
এখন তারা বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইছে এবং একটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবিকে অগ্রাহ্য করছে। তারা বলছে, বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
এ বিষয়ে আপনাদের ভুল করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের ঐক্যের স্বার্থে একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে এবং আমার মতে, তা হবে উর্দু।
এ বিষয়ে আমি আমাদের শত্রুদের এবং কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ সম্পর্কে অনেক কথা বলেছি। তাই আপনাদের সতর্ক করছি।
আপনারা, যারা জীবনের বিস্তীর্ণ পথে হাঁটতে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের এসব মানুষ থেকে দূরে রাখবেন। যারা আরও কিছুদিন পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন, তাঁরা নিজেদের স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদদের বলির পাঁঠা হতে দেবেন না।
আগেও যেমন বলেছি, নিজেদের জন্য, পিতামাতার জন্য এবং রাষ্ট্রের জন্য আপনারা পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করুন। একমাত্র এই পথেই আপনারা ভবিষ্যতের জীবনযুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন।
একমাত্র এভাবেই আপনারা নিজেদের দেশের সম্পদ, শক্তি ও গৌরব হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। এভাবেই সামনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বের মধ্যে একটি উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।
নবীন বন্ধুরা, এ কারণে আমি কয়েকটি বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যেগুলো সম্পর্কে আপনাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।
প্রথমত, আমাদের অভ্যন্তরে থাকা পঞ্চম বাহিনীর লোকদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সকল স্বার্থপর ব্যক্তির ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং তাদের প্রভাব দূর করতে হবে। কারণ, তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনাদের ব্যবহার করতে চাইবে।
তৃতীয়ত, প্রকৃত সৎ ও পরোপকারী সরকারি কর্মচারীদের চিনতে হবে এবং তাঁদের সমর্থন করতে হবে, যাঁরা তাঁদের সর্বস্ব দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে চান।
চতুর্থত, মুসলিম লীগকে আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে হবে, কারণ তারা প্রকৃত অর্থেই একটি মহান পাকিস্তান গড়ে তুলবে।
পঞ্চমত, মুসলিম লীগই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন পাকিস্তানকে গড়ে তোলার সেই পবিত্র দায়িত্ব পালনের ভারও মুসলিম লীগের ওপরই বর্তায়।
ষষ্ঠত, এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা আমাদের সংগ্রামের সময় বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি। এমনকি তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং প্রকাশ্যেই আমাদের মহান সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। শত্রুপক্ষের সহযোগীদের সংখ্যা মোটেই কম নয়।
তাঁরা হয়তো এখন তাঁদের চটকদার স্লোগান, আকর্ষণীয় আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হতে পারেন। কিন্তু তাঁদের অবশ্যই নিজেদের বিশ্বস্ততা এবং অন্তর্নিহিত চিন্তাধারায় প্রকৃত পরিবর্তন ঘটেছে কি না, তার প্রমাণ দিতে হবে।
এর সত্যতা বোঝা যাবে এই সংকটময় সময়ে তাঁদের আচরণের মাধ্যমে। তাঁরা যদি নিজেদের নামে নতুন নতুন দল গঠন না করে আমাদের মতাদর্শ ও বিশ্বাস নিয়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং দলটিকে সমর্থন করেন, তাহলে তাঁদের আন্তরিকতা প্রমাণিত হবে।
আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন বহির্মুখী ও অভ্যন্তরীণ নানা বিপদের সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে সাত কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে।
এ জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ সংহতি, ঐক্য ও শৃঙ্খলা।
একটি বিষয়ে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি—ঐক্যে উন্নতি, বিভেদে পতন।
এখন আরও একটি বিষয়ের প্রতি আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
নবীন বন্ধুরা, এখন পর্যন্ত আপনারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার রীতি অনুসরণ করে এসেছেন। যখন আপনারা ডিগ্রি নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন, তখন আপনাদের একটিই চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা থাকে—সরকারি চাকরি।
আপনাদের উপাচার্য যথার্থই বলেছেন, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার পুরোনো ও প্রচলিত রীতি ছিল সুপ্রশিক্ষিত কেরানি তৈরি করা। অবশ্য তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটিই ছিল দক্ষ কেরানি তৈরির উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা।
ব্রিটিশরাই মূলত সিভিল সার্ভিসে নিযুক্ত হতেন। পরে ভারতীয়রা এতে যোগ দিতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে তাঁদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
এই ব্যবস্থার সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি মানসিকতা তৈরি করা, যাতে একজন সাধারণ মানুষ বিএ অথবা এমএ পাস করেই একটি সরকারি চাকরি খুঁজতে থাকেন। যদি তিনি সেই চাকরি পেয়ে যেতেন, তবে মনে করতেন, জীবনে তাঁর সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
আমরা সবাই জানি, এর প্রকৃত ফলাফল কী ছিল।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন এমএ পাস ব্যক্তি একজন ট্যাক্সিচালকের চেয়েও কম আয় করেন। তথাকথিত অনেক সরকারি চাকরিজীবীও সচ্ছল পরিবারের একজন সাধারণ কর্মচারীর তুলনায় দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপন করেন।
এখন আমি চাই, আপনারা সেই প্রচলিত রীতি ও মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন। কারণ, আমরা এখন স্বাধীন পাকিস্তানের বাসিন্দা।
সরকার হাজার হাজার চাকরি দিতে পারবে না। এটি অসম্ভব। কিন্তু সরকারি চাকরির এই প্রতিযোগিতায় আপনাদের অধিকাংশই হতাশ হয়ে পড়েন। সরকার সীমিতসংখ্যক মানুষকে চাকরি দিতে পারে। যারা চাকরি পান না, তাঁদের অনেকেই কোনো পেশায় স্থির হতে পারেন না। আর এই হতাশ মানুষগুলো সহজেই স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের শিকারে পরিণত হন।
আমি চাই, আপনারা নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন সব ক্ষেত্রে পরিচালিত করুন, যেগুলো আপনাদের জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতে আরও উন্মুক্ত হবে।
কায়িক পরিশ্রম করার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই। কারিগরি শিক্ষাতেও প্রচুর সুযোগ রয়েছে, কারণ আমাদের দেশে কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের ভীষণ প্রয়োজন।
আপনারা অর্থনীতি, ব্যাংকিং, বাণিজ্য ও আইন সম্পর্কে জানতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে বর্তমানে অপরিসীম সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
ইতোমধ্যে আপনারা জানেন, নতুন নতুন কারখানা, ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর সংখ্যা আরও বাড়বে।
এই ক্ষেত্রগুলো আপনাদের জন্য উন্মুক্ত। এগুলো সম্পর্কে ভাবুন এবং নিজেদের মনোযোগ সেদিকে পরিচালিত করুন।
বিশ্বাস করুন, এভাবে আপনারা সরকারি চাকরির তুলনায় অনেক বেশি লাভবান হতে পারবেন এবং আরও সুখী হবেন। কারণ, এসব ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ অনেক বেশি। আপনারা যদি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় যোগ দেন, তাহলে নিজেদের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও সহযোগিতা করতে পারবেন।
আমি আপনাদের একটি উদাহরণ দিতে পারি।
আমি একজন তরুণকে চিনি, যিনি সরকারি চাকরিতে ছিলেন। চার বছর আগে তিনি ২০০ রুপির বেতনে একটি ব্যাংকিং করপোরেশনে যোগ দেন, কারণ তিনি ব্যাংকিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। আজ তিনি ওই করপোরেশনের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক এবং মাত্র চার বছরের মাথায় তাঁর মাসিক আয় ১,৫০০ রুপি হয়েছে।
এই সুযোগগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে। আপনারা যদি এসব বিষয় নিয়ে ভাবেন, তাহলে আমি সত্যিই খুশি হব।
পরিশেষে, আমি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। বিশেষ করে উপাচার্যকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এবং প্রশংসাসূচক বক্তব্য রাখার জন্য।
আমার আশা নয়, বরং দৃঢ় প্রত্যয় – পূর্ব বাংলার তরুণেরা আমাকে আশাহত করবেন না।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url