সংবিধান সংশোধন কমিটির নবম বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পুরো বক্তব্য
সংবিধান সংশোধন কমিটির নবম বৈঠকে ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, উচ্চকক্ষ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বক্তব্য দেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্থান: জাতীয় সংসদ ভবন
তারিখ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬
বক্তা: সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এর বক্তব্য
সংবিধান সংশোধনে ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও উচ্চকক্ষ নিয়ে যা বললেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠকের শুরু ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত
আজ আমাদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আজ দেশের সম্মানিত সংবিধান বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পাঠানো তালিকা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীদের পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আইনের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সামনে তাঁদের মতামত উপস্থাপনের জন্য আমরা এই আমন্ত্রণ জানাই। তাঁরা মৌখিকভাবে মতামত দিয়েছেন এবং অনেকেই লিখিত বক্তব্য জমা দিয়েছেন। অনেকে আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্য পাঠাবেন বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আজ যাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৬০ জন। তাঁদের মধ্যে অনেকে উপস্থিত হয়েছেন। আবার অনেকে অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। বয়সের ভারে শয্যাশায়ী কয়েকজনও তাঁদের অপারগতার কথা জানিয়েছেন। আমরা তাঁদের অনুরোধ করেছি, তাঁরা যেন লিখিত বক্তব্য পাঠান।
সকাল ১১টা থেকে দুপুরের নামাজ ও মধ্যাহ্নভোজের জন্য এক ঘণ্টার বিরতি ছাড়া বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আমাদের আলোচনা অব্যাহত ছিল। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, সবাই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং তাঁদের মতামত দিয়েছেন।
এ পর্যন্ত আমাদের যতগুলো বৈঠক হয়েছে, তার মধ্যে আজকের আলোচনা ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ। ইতিপূর্বে শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধিরা একটি বৈঠকে মতামত দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্য থেকেও কয়েকজন আজ আবার এসেছেন।
আমাদের আর এক-দুটি বৈঠক বাকি আছে। ইতিমধ্যে আমরা মতামতগুলো সংকলনের কাজ শুরু করে দিয়েছি। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা
আজকের আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের মতামতের মধ্যে যেসব বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব বা Basic Structure Theory।
এ ছাড়া প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা, আইন প্রণয়নের ওপর বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা এবং সংবিধান সংশোধনের ওপর বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা—এসব বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনা করার ক্ষমতা এবং সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁরা মতামত দিয়েছেন।
প্রশাসনিক কার্যক্রম, আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক দৃষ্টান্ত বিবেচনায় নিয়ে আমাদের বিচার বিভাগের কী ধরনের এখতিয়ার থাকতে পারে এবং বর্তমানে কী ধরনের এখতিয়ার রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেই সীমাবদ্ধতা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় এবং কোন কোন বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে ও ভোট দিতে পারবেন, তা নির্ধারণের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল এবং আস্থা ভোট—এই তিনটি বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা না রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আমাদের পক্ষ থেকে দুটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো অবস্থায় সংসদ সদস্যরা যেন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে না পারেন, সে বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম।
এই চারটি বিষয় বাদে বাকি সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন এবং নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে পারবেন—এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের জন্য বিচারক নিয়োগের আইন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং অধস্তন আদালত-সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধান নিয়েও কথা হয়েছে।
মোটকথা, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং তাদের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
এ ছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিছু বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংবিধানে বিশেষ বিধান যুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়ে অনেকে মতামত দিয়েছেন।
কেউ কেউ Statutory Constitutional Body নামে একটি ধারণার কথা বলেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তাঁদের বক্তব্যের মূল কথা হলো, বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন ও কর্মপরিধি এমনভাবে নির্ধারণ করা যায় কি না, যাতে সেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
আপনারা যদি আলোচনার সময় সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারতেন, তাহলে আমাদের এত কিছু বর্ণনা করতে হতো না। কিন্তু সংসদে এ ধরনের আলোচনা সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ নেই। আমার মনে হয়, আলোচনা সরাসরি সম্প্রচার করা হলে স্বচ্ছতা আরও বাড়ত এবং জনগণ বিশেষজ্ঞদের মতামত সরাসরি শুনতে পারতেন।
এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আপনারা প্রশ্ন করলে সেগুলোর উত্তরে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা আমাদের জন্যও সুবিধাজনক হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা
আরেকটি বিষয় বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির গঠন, আকার, গঠনের প্রক্রিয়া এবং কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। আমরা বিভিন্ন ধরনের ধারণা ও প্রস্তাব পেয়েছি।
একটি প্রস্তাব হলো, যদি উচ্চকক্ষ গঠিত হয় এবং সেটি জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হয়, তাহলে উচ্চকক্ষের মধ্য থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের স্পিকার বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একজনের প্রস্তাব হলো, ভাইস প্রেসিডেন্টকে উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
আরেকটি বিকল্প প্রস্তাব হলো, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায় কি না। স্পিকার ছাড়া অন্য উপদেষ্টারাও সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে নির্বাচিত হতে পারেন কি না, সে বিষয়েও মতামত এসেছে।
এসব প্রস্তাব আমরা বিবেচনায় রাখব। কমিটির সব প্রস্তাব পাওয়ার পর আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব এবং প্রতিবেদনে তুলে ধরব। তার ভিত্তিতে আরও বিকল্প প্রস্তাব আসতে পারে। প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে পরে সংবিধান সংশোধন বিল আসতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। আমরা সবাইকে অনুরোধ করেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও এখতিয়ার সম্পর্কে তাঁরা যেন লিখিত বক্তব্য দেন। তাহলে তাঁদের মতামতগুলো প্রতিবেদনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে তাঁদের সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদে দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে কি না?
সালাহউদ্দিন আহমদ: আমরা বিরোধী দলকে আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো আহ্বান জানাচ্ছি। বিরোধী দল যদি কোনো বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট শিথিল করতে চায়, তাহলে তাদের কমিটিতে এসে তা জানাতে হবে। তারা কোন কোন বিষয়ে শিথিলতা চায়, তা জানালে কমিটি বিবেচনা করতে পারে। এই মুহূর্তে এর বেশি মন্তব্য করতে চাই না।
প্রশ্ন: শিক্ষক ও সাংবাদিকদের দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি?
সালাহউদ্দিন আহমদ: তাঁদের মতামত আমরা শুনেছি। এগুলো বিবেচনা করব। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন: নোট অব ডিসেন্ট বাতিল বা অগ্রাহ্য করার বিষয়ে কোনো মতামত এসেছে কি?
সালাহউদ্দিন আহমদ: কেউ কেউ হয়তো এ ধরনের মতামত দিয়েছেন। কোন কোন বিষয়ে বলেছেন, তা আমাদের কাছে লিপিবদ্ধ আছে। আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে দেখব। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন: আজকের আলোচনায় সাংবিধানিক কাউন্সিলের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব এসেছে কি?
সালাহউদ্দিন আহমদ: না, আজকের আলোচনায় সাংবিধানিক কাউন্সিলের বিষয়ে কোনো কথা হয়নি।
প্রশ্ন: জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত চারটি বিষয়ের বাইরে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব এসেছে কি?
সালাহউদ্দিন আহমদ: না, এ বিষয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব আসেনি।
প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে উচ্চকক্ষের ধারণা ছাড়া অন্য কোনো প্রস্তাব এসেছে কি?
সালাহউদ্দিন আহমদ: সবার বক্তব্যে মূলত আমরা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে যে আলোচনা করেছিলাম, তার প্রতিফলন রয়েছে। বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে না রেখে কীভাবে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায়, সে বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে।
আমরা বলেছি, গঠনপ্রক্রিয়া ও এখতিয়ার সম্পর্কে সবাই লিখিত বক্তব্য দিলে আমাদের সুবিধা হবে। প্রত্যেকের মতামত পরীক্ষা করে দেখা হবে। আমরা চাই, সর্বজনগ্রাহ্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হোক।
এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ধারণাটিও একটি প্রস্তাব হিসেবে এসেছে।
উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে মতামত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে আজকের আলোচনায় সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব এসেছে কি? আর বিরোধী দলকে এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে কি?
সালাহউদ্দিন আহমদ: বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে আমরা প্রত্যেক বৈঠকেই কথা বলেছি। সংসদে আমরা আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো জানাচ্ছি, তারা যেন এসে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে।
উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে অনেকে মতামত দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির হাতে পাঁচজন সদস্য নিয়োগের যে সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে, সেটি বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অন্যান্য দেশের সংবিধানে সিনেট বা উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে সদস্য মনোনয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে মনোনয়নের মানদণ্ডও নির্ধারিত থাকে।
শিল্প, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এমন ব্যক্তি অথবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে সদস্য মনোনয়নের মতো ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। রাষ্ট্রপতি কোন কোন ক্ষেত্র থেকে সদস্য নিতে পারবেন, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তবে প্রতিটি বৈঠকেই কয়েকজন বলেছেন, আমাদের দেশ একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসারী; এখানে ফেডারেল ব্যবস্থা নেই। সে ক্ষেত্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা উচ্চকক্ষের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কেউ কেউ বলেছেন, উচ্চকক্ষ গঠন করলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ভার পড়বে এবং আর্থিক অপচয়ের আশঙ্কা থাকবে। আবার অনেকে বলেছেন, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা করা দরকার।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে কী ধরনের প্রস্তাব এসেছে? বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও কি আলোচনা হয়েছে?
সালাহউদ্দিন আহমদ: কয়েকটি কমিশন ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত হয়েছিল। সেখানে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে চারটির বিষয়ে সবাই একমত হয়েছিলেন, আর বাকি দুটির ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট ছিল।
এর বাইরে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকলে আপনারা লিখিতভাবে দিতে পারেন। আমরা সেগুলো বিবেচনা করতে পারব।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানে কিছু সংশোধনী আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে নিয়োগ ও কার্যক্রমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি দিক হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভূমিকা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বিষয়টি কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এবং জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তার বাইরে নতুন কোনো পরামর্শ পাওয়া গেলে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তা বিবেচনা করা হবে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি-সংক্রান্ত বিধান নিয়ে কমিটির অবস্থান কী?
সালাহউদ্দিন আহমদ: সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমাদের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশটি আমরা আইনে পরিণত করিনি, কারণ সেখানে অনেক ভুলত্রুটি ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমাদের অঙ্গীকার রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে সংসদের মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং অন্যান্য সংসদীয় কমিটির বিষয়ে বিধান রয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদে আমরা অন্তর্ভুক্ত করেছি যে আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দলের মধ্য থেকে নেওয়া হবে।
এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর মধ্যে পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি এবং এ ধরনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে স্পিকার যে কমিটির সভাপতি থাকেন, সেটি এর বাইরে থাকবে। অন্য গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার আগে আমাদের সংশোধনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আরও প্রশ্ন
প্রশ্ন: এখন পর্যন্ত যাঁদের মতামত নেওয়া হয়েছে, তাঁরা কি সবাই মোটামুটি একমত যে চারটি বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন?
সালাহউদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবাই একমত যে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো অবস্থায় সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন না। বাকি সব বিষয়ে তাঁদের মতামত প্রকাশ এবং ভোট দেওয়ার এখতিয়ার থাকবে। এখন পর্যন্ত এর বাইরে অন্য কোনো বক্তব্য আসেনি।
আগের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি-সংক্রান্ত বিধান এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বেশ কয়েকজন বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে স্থায়ী কমিটি-সংক্রান্ত বিষয়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল একাই বক্তব্য দিয়েছেন। সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আরও কয়েকজন বক্তব্য দিয়েছেন।
এসব বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, আমরা তা প্রতিপালন করব। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের মধ্য থেকে নেওয়ার বিষয়েও আমরা একমত। তবে এগুলো কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে প্রশ্ন
প্রশ্ন: অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে নাকি সংবিধান সংশোধন কমিটি হবে, এটি একটি রাজনৈতিক বিরোধ। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
সালাহউদ্দিন আহমদ: আমরা সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কাজ করছি। আমি এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কোনো পরিষদ গঠিত হয়নি। আমাদের সংবিধানও এ ধরনের পরিষদ গঠনের অনুমতি দেয় না—এটাই আমাদের অবস্থান।
বিরোধী দলের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার দাবি তুলেছেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে বিষয়টি মীমাংসিত। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি।
গণভোটের বিষয়টি আমরা স্বীকার করি এবং জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করি। তবে গণভোট-সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ ছিল, সেটিকে আমরা আইনে পরিণত করিনি। কারণ ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে আর কোনো ভোট হওয়ার কথা নেই।
ভবিষ্যতে যদি গণভোট হয়, তাহলে সংবিধান সংশোধনের পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গণভোট হতে পারে। সে বিষয়ে আইন রয়েছে। সেখানে সংশোধনের প্রয়োজন হলে আইন সংশোধন করা হবে।
কিন্তু যে গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার ভিত্তিতে আর কোনো ভোট হবে না। সুতরাং সেই অধ্যাদেশকে আবার আইনে পরিণত করার বাধ্যবাধকতা ছিল না।
তবে জনগণের ম্যান্ডেটকে আমরা সম্মান করি।
ধন্যবাদ।
আরো খবর,

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url