৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে নতুন অধ্যাদেশ

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করতে জারি করা হয়েছে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’। ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, বেসরকারি বিনিয়োগ, নেট মিটারিং এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা সুরক্ষায় বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে।

বাসস নতুন বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন গ্যাজেট ২০২৬

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে অধ্যাদেশ জারির বিষয়টি জানানো হয়।

ছাদ, অব্যবহৃত জমি ও জলাশয়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ভবনের ছাদ, আঙিনা, অব্যবহৃত জমি, চা-বাগান ও জলাশয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আপনার যদি একটি পুকুর থাকে, সেখানে ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারেন। কীভাবে করবেন? ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কৃষির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সমন্বিত করে অ্যাগ্রিভোলটাইক পদ্ধতিতেও প্রকল্প স্থাপন করা যাবে।

তবে বৃহৎ আকারের ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এই অধ্যাদেশের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। কারণ, অধ্যাদেশে নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন থেকে বিরত থাকুন। 

বিনিয়োগের দুটি মডেল

২০২৬ সালে বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন নিয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে যে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অপারেশনাল এক্সপেনডিচার (OPEX) ও ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (CAPEX) এই দুটি মডেলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। 

OPEX মডেলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ব্যয় বহন করতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং প্রকল্প পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয় পরিশোধের শর্ত নির্ধারিত হবে।

অন্যদিকে, CAPEX মডেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে। এতে প্রকল্পের মূলধনি ব্যয় ও মালিকানার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। 

ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ

বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে ভোক্তা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ জন্য সরকার নির্ধারিত মানসম্মত চুক্তির কাঠামো অনুসরণ করতে হবে।

চুক্তিতে প্রকল্পস্থল ব্যবহারের অধিকার, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের মান, বিদ্যুতের মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ, নেট মিটারিং এবং ব্যবহারের অনুপযোগী সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকের মাধ্যমে পরিত্যক্ত সরঞ্জাম ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তির অংশ হতে পারে।

নেট মিটারিংয়ের ব্যবস্থা

অধ্যাদেশে নেট মিটারিংয়ের বিধান রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী গ্রাহক নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ করতে পারেন। প্রযোজ্য নিয়ম ও চুক্তির ভিত্তিতে সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব সমন্বয় করা হয়।

এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যবহার এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়দায়িত্ব নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প তদারকিতে কমিটি

অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উন্নয়ন, বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নীতি পরিষদ গঠনের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জেলা পর্যায়ের কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ের কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এসব কমিটি নিজ নিজ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির কাজ করবে এবং নির্ধারিত নিয়মে ঊর্ধ্বতন কমিটিকে প্রতিবেদন দেবে।

চুরি, ভাঙচুর ও অবৈধ সংযোগে শাস্তি

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম সুরক্ষায় অধ্যাদেশে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

- বিদ্যুৎ বা সরঞ্জাম চুরি: সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

- সৌর প্যানেল বা সরঞ্জাম ভাঙচুর: সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

- অনুমোদন ছাড়া অবৈধ সংযোগ: সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

- স্থাপন, পরিদর্শন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বাধা: সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

অপরাধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট ধারার শর্ত অনুযায়ী এসব শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

সরকারের লক্ষ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা। বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রকল্প স্থাপন, বিনিয়োগ, চুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

অধ্যাদেশটির বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ, প্রকল্প অনুমোদন, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকির ওপর।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ১৯ অক্টোবর ২০২৬

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url