শ্রমিকদের রাস্তা ছেড়ে শিল্পে ফিরে যেতে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ
সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠকে শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন, শিল্পকারখানার নিরাপত্তা এবং দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় তিনি শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের মজুরিসংক্রান্ত দাবি মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, মালিকপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং দেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সড়ক ছেড়ে কারখানায় ফিরে উৎপাদন চালুর আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। শ্রমিক আন্দোলন, মজুরি বোর্ড ও বৈঠকের বিস্তারিত জানুন।
শ্রমিকদের জন্য সালাউদ্দিন আহমেদ এর বক্তব্য
সরকারি প্রতিনিধি ও গার্মেন্টস মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে যা বললেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
আমরা আজ সকালে বিজিএমইএ (BGMEA) এবং বিকেএমইএ (BKMEA)-এর গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শিল্পের মালিকপক্ষকে সকাল সাড়ে ১০টার সময় আমাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলাম।
আমাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন শ্রমমন্ত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শ্রমমন্ত্রী জনাব আরিফ সাহেব, আমাদের প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা ও মাননীয় সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস। এ ছাড়া সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আমরা সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেছি। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একই দিনে আমরা শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি এবং শ্রমিক ভাই-বোনদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও মতবিনিময় করব।
আজকের দিনের মধ্যেই সেই বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, অল্প সময়ের আহ্বানে আপনারা বিকেল ৩টার সময় এখানে উপস্থিত হয়েছেন। আপনারা আমাদের সম্মানিত করেছেন।
আমাদের সম্পর্কটা এমনই। আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি। শ্রমিক ভাই-বোন এবং মালিকপক্ষ সবাই সম্মিলিতভাবেই শিল্প পরিচালনা করেন। শুধু মালিকপক্ষ পুঁজি বিনিয়োগ করলেই একটি শিল্প গড়ে ওঠে না। মালিকের পুঁজি এবং শ্রমিকের শ্রম, উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিল্প গড়ে ওঠে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
এই পরিস্থিতিতে অবশ্যই উভয় পক্ষেরই কিছু দাবি-দাওয়া থাকে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের দাবি-দাওয়া থাকা সংগত। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য তাঁদের প্রচেষ্টা থাকে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বৃদ্ধি পায়, সেই অনুযায়ী সময়ে সময়ে তাঁদের মজুরিও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
এ জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করতে হয়। প্রতি তিন বছর অন্তর ন্যূনতম শ্রমিক মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেই অনুযায়ী মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনদের দাবি ছিল, যেন দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করা হয় এবং তাঁদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। এ বিষয়ে নির্ধারিত সময়সীমা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।
যখন থেকে এই দাবি উত্থাপিত হয়েছে, তখন থেকেই আমাদের মাননীয় শ্রমমন্ত্রী আপনাদের সঙ্গে এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছিল। মালিকপক্ষ নাম দিলেও আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনেরা কিছুটা সময় নিয়েছিলেন। সংগত কারণেই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হয়েছে।
গত পরশু রাতে তাঁদের প্রতিনিধির নাম চূড়ান্ত হয়েছে। গতকাল সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সময়ক্ষেপণ করা হয়নি।
আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব সময় নির্দেশনা দিয়েছি, যেন আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে শ্রমিক ভাই-বোনদের সড়ক থেকে সরিয়ে আনা হয়।
আজও আপনাদের মাধ্যমে আমরা আহ্বান জানিয়েছি, যেকোনো ধরনের দাবি-দাওয়া থাকলে আপনারা আন্দোলন করতে পারেন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে সেই আন্দোলন হবে স্মারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনা করতে হবে।
আলাপ-আলোচনার জন্য যেসব ব্যবস্থা ও বোর্ড রয়েছে, যেমন মজুরি বোর্ড, সেখানে আপনাদের পক্ষে আপনাদের প্রতিনিধিরা কথা বলবেন।
আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে গতকাল গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও নির্দেশনা পেয়েছি। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জীবনযাত্রার মান যেন উন্নত হয়, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতে হবে।
অবশ্যই মালিকপক্ষেরও বক্তব্য থাকতে হবে। তাঁদের শিল্প যেন চালু থাকে এবং রপ্তানি কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে সার্বিকভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ যেন বেশি করে সংরক্ষিত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা আমরা করব।
আমরা মালিকপক্ষকেও সেই আহ্বান জানিয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিল্পবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন।
একই সঙ্গে আপনাদের, আমাদের এবং সবার স্বার্থ হচ্ছে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে যেভাবে বেকারত্বের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা যেন আরও বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মিল-কারখানা চালু রাখতে হবে, যাতে কোথাও কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়। এ জন্য আমাদের সবাইকে চেষ্টা করতে হবে।
আজকে আমাদের শ্রমিক নেতৃবৃন্দ, যাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে দেশের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং অতীতে ছাত্ররাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের সবাইকে আমরা চিনি। আপনারা সবাই দেশপ্রেমিক এবং শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করছেন। আমরা সবাই মিলে আবার দেশের কল্যাণে কাজ করছি।
আপনাদের বক্তব্য শুনে আমরা খুবই উপকৃত হয়েছি।
আজকে রাস্তায় যারা সহিংস আন্দোলন করছে এবং অনিয়মতান্ত্রিক কিছু দাবি নিয়ে পরিস্থিতি তৈরি করছে, তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো সংযোগ নেই। শ্রমিক নেতৃবৃন্দেরও তাদের সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই।
আমরা গত কয়েক দিনের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এর মধ্যে কিছু মুখোশধারী লোক অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এমন কিছু কর্মকাণ্ড করেছে, যার ফলে আমাদের শ্রমিক ভাইদের ক্ষতি হতে পারে এবং তাঁদের স্বার্থহানি ঘটতে পারে।
আমরা ইতিমধ্যে শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে আশ্বস্ত করেছি। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিভিন্ন ঘটনার শিকার হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের বিষয়টি আমরা দেখব। আইনানুগভাবে তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের বিষয়েও যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমাদের আহ্বান থাকবে, এখন থেকে সবাই শিল্পে ফিরে যাব, উৎপাদনে ফিরে যাব এবং নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাব।
যাঁরা এখনো মজুরি বোর্ড গঠনের পরও ইচ্ছাকৃতভাবে সড়ক ও মহাসড়কে অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন, তাঁরা অবশ্যই শ্রমিকের বন্ধু হতে পারেন না। তাঁদের ভিন্ন কোনো স্বার্থ থাকতে পারে। আমরা বিষয়টি সেভাবেই দেখব।
তবে আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাব, আপনারা সবাই আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনদের বোঝাবেন যে তাঁদের মজুরির বিষয়টি এখন মজুরি বোর্ড দেখছে। আজকেই হয়তো মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আহ্বান করা সম্ভব হতো। আশা করি, খুব শিগগিরই সভা অনুষ্ঠিত হবে।
আমরাও এ বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছি। সেখানে আপনাদের প্রতিনিধি থাকবেন, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি থাকবেন। তাঁরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবেন।
আমরা সবাই মিলে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখব। শিল্পের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখব। দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখব এবং রপ্তানি বৃদ্ধি করব। সবাই মিলে আমরা এগিয়ে যাব, ইনশা আল্লাহ।
ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে।
আরো খবর পড়ুন,
২. শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে রাশেদ খানের বক্তব্য
৩. এর আগে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে যা বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url